থানায় মামলা না নিলে কি করবেন?

পুলিশ মামলা না নিলে কি করবেন


ফরিয়াদী আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের পর কেউ থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশ বিনামূল্যে সে মামলা নিতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই এমন অভিযোগ শোনা যায় যে, পুলিশ থানায় মামলা নিতে চায় না। 

তাই, আমার আজকের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে - "থানায় মামলা না নিলে কি করবেন", অর্থাৎ থানায় মামলা না নিলে করণীয়।

থানায় মামলা না নিলে যেভাবে মামলা করবেন :

কোন কারণে পুলিশ যদি কখনো থানায় মামলা নিতে না চায়, তাহলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিচারিক হাকিমের আদালতে নালিশি অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে মামলা দায়ের করা যায়।

তবে সংঘটিত অপরাধ আমল অযোগ্য হলে সবসময়ই সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নালিশি মামলা দায়ের করতে হয়। আমল অযোগ্য অপরাধ হলো সেই সমস্ত অপরাধ যে সকল অপরাধ সংঘটনের দরুণ পুলিশ বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না এবং এ সকল অপরাধ বিষয়ে তদন্ত করতেও সংশ্লিষ্ট বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়।

কোনটি আমলযোগ্য এবং কোনটি আমলঅযোগ্য অপরাধ তা ফৌজদারী কার্যবিধির দ্বিতীয় তফশীলের তৃতীয় কলামে বিধৃত করা রয়েছে।

ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী নালিশ মানে হলো কোন অপরাধ সংঘটন বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার নিমিত্তে মৌখিক বা লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিচারিক হাকিমের নিকট আবেদন জানানো।

যদি কোন আমল অযোগ্য অপরাধ সংঘটনের খবর কেউ সংশ্লিষ্ট থানায় নিয়ে যা,য় তবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (O.C) বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিতে (G.D) লিপিবদ্ধ করে অভিযোগসহ অভিযোগকারীকে মহানগরের ক্ষেত্রে মুখ্য মহানগর হাকিম বা মহানগর হাকিম এবং মহানগরের বাইরের এলাকার ক্ষেত্রে মুখ্য বিচারিক হাকিম বা কোন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট অথবা বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করবেন।

এক্ষেত্রে থানায় না যেয়ে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট যেয়েও লিখিত বা মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার প্রার্থনা করা যায়। অথবা পুলিশ যদি আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের পর থানায় এজাহার নিতে অস্বীকৃতি জানায় সেক্ষেত্রেও সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নালিশি মামলা দায়ের করা যায়।

ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি :

ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট মৌখিকভাবে অভিযোগ দায়ের করতে চাইলে ঘটনার আদ্যোপান্ত আদালতে খুলে বলে ঘটনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আবেদন করতে হবে। তারপর দায়েরকৃত অভিযোগের কোন ভিত্তি আছে কি-না তা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগকারীকে এবং প্রয়োজন মনে করলে ঘটনার কোন সাক্ষী থাকলে তাঁদেরকে শপথের মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন। পরীক্ষার সারসংক্ষেপ লিখে তিনি নিজে, অভিযোগকারীর এবং কোন সাক্ষী থাকলে তাঁর স্বাক্ষর নিবেন। তবে কেউ দরখাস্ত আকারে ঘটনার পূর্ণ বিবরণসহ লিখিত অভিযোগ দায়ের করে প্রতিকার দাবী করলে এরূপ পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হলে বা লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগটিকে একটি সি.আর কেস নম্বর (Complaint Register case number) বা সি.আর.পি কেস নম্বর (Complaint Register Petition case number) দিয়ে নথিভুক্ত করবেন। এজন্য একে সি.আর মামলাও বলে।

তবে শপথ পরীক্ষার সময় সংশ্লিষ্ট বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট যদি অপরাধ সংঘটন বিষয়ে অভিযোগকারীর বক্তব্যে সন্তুষ্ট না হন অথবা যদি অভিযোগকারী মামলার ভিত্তি (Prima facie) প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন তবে ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি আমলে না নিয়ে আবেদনটি খারিজ করে দিতে পারেন। নালিশি পিটিশনটি খারিজ হলে অভিযোগকারী খারিজাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে দায়রা জজ আদালতে বা হাইকোর্ট বিভাগে উক্তাদেশ ঘোষণার ৬০ দিনের মধ্যে রিভিশনের আবেদন করতে পারেন।

অভিযোগ আমলে নেয়ার ফলাফল ও তদন্তে প্রেরণ :

অভিযোগটি আমলে নিলে ম্যাজিস্ট্রেট বিবাদী পক্ষের বিরুদ্ধে সমন জারী করে আদালতে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিতে পারেন অথবা আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নিতে থানাকে নির্দেশ দিতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট থেকে আদেশপ্রাপ্ত হলে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগটি থানায় এজাহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে মামলার জন্য প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করবে। আবার আমল অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত করতে ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারেন।

এক্ষেত্রেও আদিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অভিযোগটির বিষয়ে তদন্ত শুরু করবে এবং তদন্তকালীন সময়ে আমলযোগ্য অপরাধ তদন্ত করার মতোই ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে। অভিযোগের তদন্ত শেষে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিলে কিংবা অভিযোগের কোন ভিত্তি খুঁজে না পেলে পুলিশের দাখিলকৃত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী নারাজি দিতে পারেন অর্থাৎ পুলিশ প্রতিবেদনে তিনি কেন সন্তুষ্ট নন আদালতে সে কারণ দর্শনীয় অভিযোগটির পুনঃ তদন্তের আবেদন করতে পারেন।

তবে প্রয়োজন মনে করলে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অথবা অধিকতর তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার উদ্দেশ্যে তিনি নিজে বা তাঁর অধস্তন অন্য কোন ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দিতে পারেন। অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও তদন্ত কার্যে সম্পৃক্ত করতে পারেন।

মনে রাখা জরুরি :


নালিশি মামলার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রথম থেকেই পক্ষ হয়ে মামলা শুরু করে না। যেমনটা থানায় এজাহার রুজুর মাধ্যমে মামলা দায়ের করলে রাষ্ট্র নিজে পক্ষভুক্ত হয়ে পরবর্তীতে মামলা পরিচালনা করে। ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নেয়ার আদেশ দিলে রাষ্ট্র তখন মামলার পক্ষ হয়ে পরবর্তীতে মামলা পরিচালনা করে। তাই নালিশি মামলার ক্ষেত্রে কেউ অভিযোগ দায়ের করে পরবর্তী শুনানির দিন যদি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির না হন কিংবা ঘটনা তদন্তান্তে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হয় তবে ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি খারিজ করে দিতে পারেন। অভিযোগকারী চাইলে এ ধরনের খারিজাদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে বা হাইকোর্ট বিভাগে উক্ত আদেশ ঘোষণার ৬০ দিনের মধ্যে রিভিশন আবেদন করতে পারেন। নালিশি মামলা সাধারণত ক্ষতিগস্ত ব্যক্তিই রুজু করতে পারেন।

আমার শেষ কথা :


কাজেই থানায় কখনও মামলা নিতে না চাইলে বিচলিত হয়ে নিজেকে অসহায় ভাবার কোন কারণ নেই। আইনানুযায়ী যে কেউই এরকম পরিস্থিতিতে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে নালিশি মামলা দায়ের করে আইনের আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারেন। তবে আমাদের দেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসহায় ও দরিদ্র বিচারপ্রার্থীরা থানায় আইনের আশ্রয় না পেলে পুলিশকে টপকে অজ্ঞতা, দৈনতা ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার দরুণ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। জনগণের ন্যায় বিচার পাবার অধিকার নিশ্চিত করতে তাই এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের আইনগত সহায়তা প্রদান কর্মসূচীও ব্যাপক পরিসরে বাড়ানো উচিত। অপরাধ সংক্রান্ত মামলার বিচারের জন্য আসামীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণ করতে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যাবশ্যক। পক্ষপাতহীন একটি তদন্ত রিপোর্ট একদিকে যেমন মামলাটিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে ঠিক তেমনি তদন্ত প্রক্রিয়া আসামীদের দ্বারা কোনভাবে প্রভাবিত হলে তা পুরো মামলার মোড় ঘুরিয়েও দিতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত রাষ্ট্র বাদী হয়ে মামলা রুজু করে এবং ঘটনা তদন্তের দায়ভার পুলিশের ওপরই বর্তায়। 

আরো পড়ুনঃ মানহানি মামলা কি? 


অভিযুক্ত আসামীদের অপরাধ প্রমাণে প্রশ্নাতীত তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করতে পুলিশে লোকবল, সময়ের, অবকাঠামোর, আনুষাঙ্গিক দ্রব্যাদির যেমন অভাব রয়েছে তেমনি কিছু পুলিশের কাছ থেকে অপরাধ তদন্তে যে সব সময় যথেষ্ট দক্ষতা, নিষ্ঠা, সততা ও কর্ম উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়না একথাও নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবেন না। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রভাবমুক্তভাবে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল না করার অভিযোগ অনেক পুরোনো। এ ধরণের ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আসামীদের সাথে পুলিশের যোগসাজশে কিংবা রাজনৈতিক, সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন মাধ্যমে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে পুলিশকে প্রভাবিত করে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে তদন্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করার ব্যবস্থা করে। অপরাধ সংঘটনের পর মামলা দায়ের করা হলে কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট থেকে আদেশ প্রাপ্ত হলে পুলিশ তদন্ত কাজ শুরু করতে বাধ্য। পুলিশের দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করা। তবে ঘটনা বা অপরাধের মাত্রার ওপর নির্ভর করে ক্ষেত্র বিশেষে ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে পুলিশের সময় চেয়ে করা আবেদন আমলে নিয়ে তদন্তের মেয়াদ বাড়িয়ে দিতে পারেন। আবার তদন্তের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বদলও করতে পারেন।

আজকের আর্টিকেলটি (থানায় মামলা না নিলে কি করবেন?)  পছন্দ হলে শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দেয়ার অনুরোধ রইলো। আর যদি আপনাদের মনে আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে তা নিচে কমেন্ট করেও জানাতে পারেন।

যে কোন আইনী পরামর্শের জন্যে যোগাযোগ করতে ইমেইল করুন -
Email: info.shuhag@gmail.com
অথবা,
কন্টাক্ট বক্সে মেসেজ করতে পারেন।

নবীনতর পূর্বতন