দেওয়ানি মামলা কাকে বলে | কোন দেওয়ানি আদালতে মামলা করবেন | দেওয়ানি মামলার ধাপ সমূহ আলোচনা করো

দেওয়ানি মামলা কি

দেওয়ানি মামলা কাকে বলে?

সম্পত্তির উপর স্বত্ব ও দখলের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলে যে মামলার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হয় তাকে দেওয়ানি মামলা বলা হয়। দেওয়ানি মামলাকেই আদালতের ভাষায় মোকদ্দমা বলা হয়।

সব ধরনের দৃশ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং অদৃশ্য সব ধরনের অধিকার সংক্রান্ত মোকদ্দমা হচ্ছে দেওয়ানি আদালতের বিচার্য বিষয়।

সাধারণভাবে দেওয়ানি মামলার বিষয়বস্তু :

১। যেকোনো ধরনের সম্পত্তি বা স্বত্ব নিয়ে যে মামলা হয় মূলত তাই দেওয়ানি আদালতের বিচার্য বিষয়।

২। কোনো মানবিক সম্পর্ক (পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক) নিয়ে যদি বিরোধ দেখা যায় তবে তা দেওয়ানি আদালতের বিচার্য বিষয়।

৩। মসজিদের নামাজ পড়া বা মন্দিরে পূজা করার অধিকার নিয়ে দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করা হয়।

৪। ভোটাধিকার নিয়েও দেওয়ানি আদালতে মামলা করা হয়।

সাধারণভাবে বলা যায়, সব ধরনের স্বত্ব, অধিকার, দাবি প্রভৃতির মামলা দেওয়ানি আদালতের আওতাভুক্ত।

কোন দেওয়ানি আদালতে মামলা করবেন? 

সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ) ছাড়াও আমাদের দেশে পাঁচ ধরনের দেওয়ানি আদালত আছে।

জেলা জজ আদালত:

হাইকোর্ট বিভাগের পরেই জেলা জজের স্থান। জেলার সর্বোচ্চ আদালতই জেলা জজ আদালত। এ আদালত যখন দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা করে তখন তাকে দেওয়ানি আদালত বলা হয়।আবার যখন ফৌজদারী মামলার বিচার করলে তাকে ফৌজদারী আদালত বলে।

১। ১ লাখ হতে ৫ লাখ পর্যন্ত মূল্যমানের মামলার আপীল জেলা জজ আদালতে করতে হয়।

২। সাকসেশন সার্টিফিকেট, লেটার অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইত্যাদি জেলা জজ ইস্যু করতে পারেন।

আরো পড়ুনঃ ফৌজদারি মামলা কাকে বলে? 

৩। জেলা জজ আদালত তার নিম্ন আদালতের মোকদ্দমা স্থানান্তর সম্পর্কিত দরখাস্ত, রিভিশন শুনানী গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করতে পারেন।

৪। পারিবারিক আদালতের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে জেলা জজ আপীল গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করে থাকেন।

অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত:

অতিরিক্ত জেলা জজের বিচারিক ক্ষমতা জেলা জজের সমান। তবে কোনো মোকদ্দমা বা আপীল এই আদালতে সরাসরি দায়ের করা যায় না।

১। জেলা জজ আদালতে দাখিলকরা দরখাস্ত নিষ্পত্তির জন্য এ আদালতে প্রেরণ করা হলে তা শুনানী শেষে নিষ্পত্তি করা হয়।

২। অতিরিক্ত জেলা জজের কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই।

যুগ্ম জেলা জজ:

প্রত্যেক জেলায় এক বা একাধিক যুগ্ম জেলা জজ থাকেন। তিনি দেওয়ানি মোকদ্দমার সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচারক।

এ আদালত ৪ লক্ষ ১ টাকা হতে অসীম মূল্যমানের বিষয়বস্তুর মূল মোকদ্দমা গ্রহণ ও বিচার নিষ্পত্তি করতে পারেন।

সিনিয়র সহকারি জজ:

প্রত্যেক জেলায় সাধারণত এক বা একাধিক সিনিয়র সহকারি জজ আদালত থাকে। সম্পত্তি, অফিস, ব্যক্তিগত অপকার, ক্ষতিপূরণ ও ধর্মীয় অধিকার-সংক্রান্ত যাবতীয় মোকদ্দমা সিনিয়র সহকারি জজ ও সহকারি জজ আদালতে দায়ের করা হয়।

এ আদালত দুই লক্ষ ১ টাকা হতে ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মূল মোকদ্দমা গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করতে পারে।

সহকারি জজ আদালত:

এ আদালত সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের বিষয়বস্তুর মূল মামলা বিচারের জন্য গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করতে পারে। এ আদালতের কোনো আপিল এখতিয়ার নেই।

সিনিয়র সহকারি জজ ও সহকারি জজ আদালতে কী কী মামরা করা যায় :

১। স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমা।

২। স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মোকদ্দমা।

৩। চুক্তি কার্যকরের মোকদ্দমা।

৪। দলিল, চুক্তিপত্র, লিখিত অঙ্গীকারপত্র ইত্যাদি রদ ও রহিতের জন্য মোকদ্দমা।

৫। যেকোনো কর্তৃপক্ষের অবৈধ আদেশ রদ ও রহিতের মোকদ্দমা।

৬। দখল পাওয়ার মোকদ্দমা।

৭। সম্পত্তি বা অফিস সংক্রান্ত কোনো অধিকার সম্পর্কে ঘোষণা পাওয়ার মোকদ্দমা।

৮। টাকা পাওয়ার মোকদ্দমা।

৯। সম্পত্তি অগ্রক্রয়ের মোকদ্দমা।

১০। নির্বাচনসংক্রান্ত মোকদ্দমা।

দেওয়ানী মামলার ধাপসমূহ :

প্রায় ৬ মাস ধরে জমি নিয়ে মামলা চলছে তালুকদার সাহেবের। আইনজীবী যেভাবে বলছেন সেভাবেই সব কিছু করে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজে মামলা সম্পর্কে কিছুটা জানলে ভালই হতো। হয়তো আরো খানিকটা নিশ্চিত হতে পারতেন সবকিছু ঠিকমতো চলছে কিনা সেই বিষয়ে। তালুকদার সাহেবদের মতো সচেতন মানুষদের জন্য আজ দেওয়ানী মামলার ধাপসমূহ নিয়ে লেখা হল।

১। প্রতিটি দেওয়ানী মামলা শুরু হয় আরজি (Plaint) গ্রহণের মাধ্যমে। বাদীর নালিশের লিখিত বিবরণীকে আরজি বলা হয়। আরজিতে সকল তথ্য সঠিক না জানালে বা নিয়মানুযায়ী উপস্থাপন না করলে আরজি গৃহীত নাও হতে পারে।

২। সমন মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সমনের ক্ষেত্রে কোন ধরণের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা মামলার পরবর্তী ধাপগুলো অকার্যকর করতে পারে। মামলা যথাযথভাবে দায়ের হলে বিবাদীকে হাজির হয়ে বাদীর দাবির জবাব দেওয়ার জন্য সমন দেওয়া হয়।

৩। সমনে উল্লেখিত দিনে বিবাদীকে আদালতে উপস্থিত হতে হয় ও জবাব দাখিল করতে হয়।

৪। প্রয়োজন হলে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধের সমাধান করা যায়। যেমন- সমঝোতা, সালিস প্রভৃতি। • বিকল্প পদ্ধতিতে সমাধান না হলে আদালত প্রথম শুনানির তারিখ দিবে।

৫ ।প্রথম শুনানির তারিখে যদি দেখা যায় বিরোধের বিষয় নেই তবে তা নিষ্পত্তি করা যাবে।

৬। মামলার বিচার্য বিষয়গুলো গঠনের পর আদালত চূড়ান্ত শুনানির তারিখ দিবে। বিরোধের বিচার্য বিষয়গুলো নির্ধারণের জন্য প্রশ্নোত্তর, সাক্ষ্য হিসেবে দলিল গ্রহণ, তদন্ত প্রভৃতি করা হবে।

৭। জেরা করা, সাক্ষ্য, পুনঃসাক্ষ্য, যুক্তিতর্ক প্রভৃতি চূড়ান্ত শুনানির অন্তর্ভুক্ত। চূড়ান্ত শুনানির পর বিচারক তৎক্ষণাৎ বা পরবর্তী যেকোন দিনে রায় ঘোষণা করবেন।

৮। রায় কার্যকর করার জন্য ৭ দিনের মধ্যে ডিক্রি প্রদান করা হয়।

এক নজরে এই হল দেওয়ানী মামলার অনুসারিত ধাপ সমূহ।


আজকের আর্টিকেলটি (দেওয়ানি মামলা কাকে বলে | কোন দেওয়ানি আদালতে মামলা করবেন | দেওয়ানি মামলার ধাপ সমূহ আলোচনা করো)  পছন্দ হলে শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দেয়ার অনুরোধ রইলো। আর যদি আপনাদের মনে আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে তা নিচে কমেন্ট করেও জানাতে পারেন।

যে কোন আইনী পরামর্শের জন্যে যোগাযোগ করতে ইমেইল করুন - 

Email: info.shuhag@gmail.com

অথবা, 

কন্টাক্ট বক্সে মেসেজ করতে পারেন।

আরো পড়ুনঃ গর্ভবতী কর্মজীবী মহিলার আইনী অধিকার

নবীনতর পূর্বতন